আহবান নিউজ২৪ :
বাংলাদেশ পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে পদোন্নতির এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে আছেন। মেধা ও যোগ্যতার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পদোন্নতি কার্যকর না হওয়ায় তাদের মধ্যে গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী সহকারী উপপরিদর্শক সশস্ত্র থেকে উপপরিদর্শক সশস্ত্র পদে ১০২৯ জন এবং সহকারী উপপরিদর্শক নিরস্ত্র থেকে উপপরিদর্শক নিরস্ত্র পদে ৯৪৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। একইসাথে ৬০ জন এটিএসআই ট্রাফিক সার্জেন্ট বা টিএসআই পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তবে পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়া এই দুই হাজারেরও বেশি কর্মকর্তার সাফল্য এখনো দাপ্তরিক ফাইল আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য এই বিলম্ব শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয় বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং মেধার অবমূল্যায়নের এক করুণ চিত্র।
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া এই পদোন্নতি জট তিন দশক পার হলেও আজও পুরোপুরি নিরসন হয়নি। গত কয়েক দশকে দেশে একাধিকবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও পুলিশের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের এই ভাগ্য বিড়ম্বনা প্রায় একই রয়ে গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে যে এই দীর্ঘস্থায়ী জট নিরসনে প্রায় চার হাজার নতুন উপপরিদর্শক নিরস্ত্র পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে এই নতুন পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে পদ বন্টন প্রক্রিয়া নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে নতুন সৃষ্ট এই পদগুলোতে যদি সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ এবং বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় পাশ করা নিরস্ত্র সশস্ত্র ও টিএসআই সদস্যদের মধ্য থেকে বাকি ৫০ শতাংশ পূরণ করা হয় তবেই পদোন্নতির বর্তমান জটলা অনেকটা কমানো সম্ভব হবে। অন্যথায় কেবল সরাসরি নিয়োগকে প্রাধান্য দিলে বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের বঞ্চনা আরও দীর্ঘায়িত হবে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে একজন কর্মকর্তা যখন বছরের পর বছর একই পদে থেকে দায়িত্ব পালন করেন তখন তার কাজের প্রতি আগ্রহ ও উদ্যোগ কমে যায়। পদোন্নতির বিলম্ব তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে। দীর্ঘ তিন দশকের এই বঞ্চনার ইতিহাস থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যদি রাজনৈতিক আনুগত্যকে পদোন্নতির মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় তবে তা পেশাদারিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
পুলিশের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরে পদোন্নতির একটি নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ সময়সীমা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। যদি শূন্যপদ সৃষ্টি এবং পদায়ন প্রক্রিয়াগুলো মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা যায় তবে বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও কর্মীদের মনোবল দুটোই বাড়বে। ১৯৯০ সাল থেকে চলে আসা এই অচলাবস্থা ভেঙে প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ কোটা বণ্টন পদ্ধতি অনুসরণ করে দ্রুত পদায়ন নিশ্চিত করা না গেলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমান সরকারের কাছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা হলো যেন দলীয় বলয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফল ও ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে দ্রুত এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাহিনীর পেশাগত মানকে আরও শক্তিশালী করা হয়।