
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। আজ ৯ ডিসেম্বর এই মহীয়সীর ১৪৫তম জন্ম ও ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি পালন করা হয় ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে। এই দিবস ঘিরে রংপুরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। সেই সঙ্গে চালু হচ্ছে দীর্ঘ ১৩ বছর বন্ধ থাকা ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র’।
দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, নারীমুক্তি ও মানবাধিকার নিয়ে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারীসমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
রোকেয়া পদক পাচ্ছেন ৪ নারী
রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রোকেয়া পদক প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। নারীশিক্ষা, নারী অধিকার, মানবাধিকার ও নারী জাগরণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার চার নারীকে রোকেয়া পদক ২০২৫ দেওয়া হচ্ছে। তারা হলেন– নারীশিক্ষা শ্রেণিতে (গবেষণা) রুভানা রাকিব, নারী অধিকার শ্রেণিতে (শ্রম অধিকার) কল্পনা আক্তার, মানবাধিকার শ্রেণিতে নাবিলা ইদ্রিস ও নারী জাগরণ শ্রেণিতে (ক্রীড়া) ঋতুপর্ণা চাকমা। আজ সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চারজনের হাতে রোকেয়া পদক তুলে দেবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বেগম রোকেয়ার জীবন, কর্ম ও আদর্শ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানাতে তাঁর জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে গড়ে তোলা হয় ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র’। মিলনায়তন, সেমিনার কক্ষ, গ্রন্থাগার, গবেষণাকেন্দ্র, সংগ্রহশালা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র মিলে বেশ সমৃদ্ধ এটি। আলো ছড়ানো কেন্দ্রটি গত ১৩ বছর বন্ধ ছিল। অবশেষে এটি চালু হচ্ছে আজ।
বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালে পায়রাবন্দে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৮ সালে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামীর উৎসাহে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে লেখেন মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী এবং সুলতানা’স ড্রিম, যা পরে ইউনেস্কোর ‘বিশ্বস্মৃতি’ তালিকায় স্থান পায়। বেগম রোকেয়া ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সোদপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ তাঁর দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার দাবি করছেন।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন কেন্দ্রটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এটি উদ্বোধন করা হয় ২০০১ সালের ১ জুলাই। রোকেয়ার বসতভিটার সোয়া তিন একর জমির ওপর নির্মিত কেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হয় তিন কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্প ছিল, যা বাংলা একাডেমি চালাত। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০০৪ সালের ৫ অক্টোবর স্মৃতিকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে তা একই বছর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যায়।
ওই সময় কেন্দ্রটি বিকেএমইর শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু স্মৃতিকেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ বিকেএমইকে উচ্ছেদের জন্য ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে রিট করেন। উচ্চ আদালত স্মৃতিকেন্দ্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রমিক তৈরির কারখানা বন্ধের আদেশ দেন। পরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ২০১২ সালের ১ মে বিকেএমইকে সরিয়ে দেয়। ওই সময় থেকে স্মৃতিকেন্দ্রের কাজ বন্ধ ছিল। অবশেষে রোকেয়া দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি শুরুর দিন আজ এটি চালু করা হচ্ছে।
স্মৃতিকেন্দ্রে রয়েছে বেগম রোকেয়ার একটি ম্যুরাল, ২৬০ আসনের আধুনিক মিলনায়তন, ১০০ আসনের সেমিনার কক্ষ, ১০ হাজার পুস্তক ধারণক্ষমতার লাইব্রেরি, চার হাজার বিভিন্ন বইপত্র-পত্রিকা, গবেষণাকেন্দ্র, সংগ্রহশালা, ২৫টি সেলাই মেশিনসহ একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সেই সঙ্গে রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যালয় ও উপপরিচালকসহ কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা। সামনে স্থাপন করা হয়েছে পিতলের তৈরি বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য।
বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক ও স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবিদ করিম মুন্না সমকালকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন অবহেলার পর অবশেষে স্মৃতিকেন্দ্র চালু হচ্ছে। এখানে তিনটি ট্রেডে ৮০ জন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নেবেন। দুস্থ নারীদের সেলাই শিল্পে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও সংগীত শেখানো হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, স্মৃতিকেন্দ্র সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য প্রস্তাবিত ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায়। বরাদ্দ না পাওয়ায় উন্নয়নকাজ আটকে আছে। বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের বরাদ্দ একনেকে পাস হচ্ছে না। তাই অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে না। এ কারণে সংস্কার ও আধুনিকায়ন কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরাদ্দ পাসের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাই।’
এদিকে বেগম রোকেয়ার পৈতৃক ভিটা ছিল প্রায় ৩৫০ বিঘা জমিতে। তবে ১৯৪০ সালের এসএ রেকর্ড অনুযায়ী এর ৫১ একর ৪৬ শতক সম্পত্তি এখন দখলদারদের দখলে। পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদ উচ্চ আদালতে মামলা করেছে। রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, রোকেয়ার নামে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে তার বেশির ভাগই অযত্নে। জমি উদ্ধারের পাশাপাশি স্মৃতিকেন্দ্রের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
রোকেয়া দিবসে এবার পুষ্পমাল্য অর্পণ, পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, রক্তদান কর্মসূচি, আলোচনা সভা, নাটিকা, চিত্রাঙ্কন, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পায়রাবন্দে আজ বসেছে তিন দিনব্যাপী মেলা। যেখানে সার্কাস, পুতুলনাচ, মোটরসাইকেল খেলা থেকে শুরু করে মনিহারি ও কাঠের পণ্য থাকবে।
আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ২০২৫ উপলক্ষে নানান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। তার অংশ হিসেবে রাজধানীতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম মুনিরা খান মিলনায়তনে গতকাল বিকেলে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপপরিষদ এবং সংগঠন উপপরিষদের যৌথ উদ্যোগে তরুণদের বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিতর্কের বিষয় ছিল– শুধু সমাজসংস্কারক নয় বরং রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ।
সূত্র : সমকাল