
গত ৫ অক্টোবর এ ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তিন বিজ্ঞানীকে ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা হলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. কার্ল ডেইসেরথ (৫৪); জার্মানির বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. পিটার হেগেমান (৭১); এবং জার্মানির উয়ার্জবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জর্জ নাগেল (৭৩)।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের নিউরোটেকনোলজির অধ্যাপক ড. সাইমন শুলৎজ এই আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আলো ও জিনতত্ত্বের সমন্বয়ে কোষকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা জীববিজ্ঞানের সব শাখায় রূপান্তরমূলক পরিবর্তন এনেছে।’
আলোক-জিনতত্ত্ব ও এর চিকিৎসাগত ব্যবহার সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিন আবিষ্কার
এক ধরনের সবুজ শৈবালে অধ্যাপক হেগেমান ও অধ্যাপক নাগেল আলো-সংবেদনশীল একটি বিশেষ প্রোটিন আবিষ্কার করেন। তারা এর নাম দেন ‘চ্যানেলরোডপসিন’। পরবর্তীতে অধ্যাপক ডেইসেরথ জিনগত পদ্ধতিতে প্রোটিনটি একটি কোষে প্রবেশ করান এবং তাতে আলো প্রয়োগ করেন। এর ফলে ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের স্নায়ুসংকেত সফলভাবে সক্রিয় করা সম্ভব হয়।
মস্তিষ্কের ম্যাপিং ও আচরণ নিয়ন্ত্রণআলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে স্নায়ুকোষের সংকেত চালু ও বন্ধ করতে পারেন। কিছু স্নায়ুকোষ নিষ্ক্রিয় করে অন্যগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা শনাক্ত করতে পারেন, মস্তিষ্কের কোন অঞ্চলগুলো নির্দিষ্ট কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে।
নোবেল চিকিৎসাবিজ্ঞান কমিটির সদস্য ও স্নায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আবদেল এল মানিরা বলেন, এ আবিষ্কার ‘সন্তান লালন-পালনের আচরণ ও আগ্রাসন থেকে শুরু করে উদ্বেগ, ভয়, এমনকি তৃষ্ণা ও পানি পান করার মতো মৌলিক শারীরবৃত্তীয় চাহিদা’ পর্যন্ত নানা কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে।
স্মৃতিশক্তি পুনরুদ্ধার
অধ্যাপক শুলৎজ বলেন, তার গবেষক দল স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যার চিকিৎসায় ‘ক্লোজড-লুপ’ পদ্ধতি হিসেবে আলোক-জিনতত্ত্ব ব্যবহার করেছে। এ পদ্ধতিতে মস্তিষ্ককে স্মৃতি সংরক্ষণে সহায়তা করা আলোক-স্পন্দনের স্থায়িত্ব বাড়ানো হয়।
তিনি বলেন, ‘পরবর্তী পদক্ষেপ হলো জটিল কাজের ক্ষেত্রে আমরা মানুষের শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটাতে পারি কি না, তা প্রমাণ করা।’
অন্ধত্ব দূরীকরণে নতুন আশা
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিকেল স্কুলের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. হোসে-আলাঁ সাহেল বলেন, তার দল একটি অবক্ষয়জনিত চোখের রোগের চিকিৎসায় আলোক-জিনতত্ত্ব প্রয়োগ করে আশাব্যঞ্জক পরীক্ষা চালিয়েছে। তারা জিন থেরাপির মাধ্যমে রোগীর ত্রুটিপূর্ণ চোখের কোষে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনটি প্রবেশ করান। এরপর বিশেষ ধরনের চশমার সাহায্যে চোখে আলো ফেলা হয়। এতে সফলভাবে রেটনার কোষগুলো সক্রিয় হয়।
ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ আণবিক জীববিজ্ঞানী ড. মার্কো ত্রিপোদি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক দ্রুত চিকিৎসাগত অগ্রগতির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র সম্ভবত দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার।’
পারকিনসন ও মৃগীরোগের নিরাময়
সরাসরি চিকিৎসায় ব্যবহারের পাশাপাশি আলোক-জিনতত্ত্ব ‘স্নায়বিক ও মানসিক রোগের নতুন চিকিৎসালক্ষ্য শনাক্ত করার গবেষণার হাতিয়ার’ হিসেবেও কাজে লাগতে পারে বলে জানান ড. ত্রিপোদি। তিনি বলেন, মৃগীরোগ ও পারকিনসন রোগ এমন দুটি সুস্পষ্ট উদাহরণ, যেখানে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের গোষ্ঠীকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্পেনের সিইইউ কার্ডেনাল হেরেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. হোর্হে ব্রোতোন্স মাস বলেন, নোবেলজয়ী এই গবেষণা আলঝেইমার ও মৃগীরোগের মতো অসুস্থতায় মস্তিষ্কে কী ধরনের ত্রুটি ঘটে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে সহায়তা করবে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও পিটিএসডি
বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী বলেছেন, বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যার চিকিৎসায় সহায়তা করাও এ গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য। ইম্পেরিয়াল কলেজের বায়োইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ক্রিস্টোফার রোল্যান্ডস উল্লেখ করেন, মানসিক আঘাত-পরবর্তী স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) ও আসক্তির মতো সমস্যার চিকিৎসায় আলোক-জিনতত্ত্ব ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বর্তমানে চলমান রয়েছে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের ওপর এটি সফল হলেও মানুষের মস্তিষ্কে সরাসরি আলো ফেলার জন্য খুলির ভেতর অপটিক্যাল ফাইবার বা তার প্রবেশ করানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু তারহীন ন্যানোপ্রযুক্তি বা অবলোহিত আলো নিয়ে কাজ করছেন, যা বাইরে থেকেই খুলি ভেদ করে প্রোটিনকে উদ্দীপিত করতে পারবে। এই বাধা দূর হলে মানবদেহে এর প্রয়োগ সহজ হবে।
চেতনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসুইডেনের স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা কমিটির সদস্যদের কাছে জানতে চান, এই বিজ্ঞান মানুষের বাস্তব চেতনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মধ্যে সাদৃশ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে কি না।
জবাবে অধ্যাপক এল মানিরা বলেন, ‘আপাতত এই প্রযুক্তি চেতনা কী, তা পুরোপুরি বুঝতে আমাদের সহায়তা করে না। তবে মানুষের মস্তিষ্কের জটিল নেটওয়ার্ক বুঝতে এটি সাহায্য করছে।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আগামী কয়েক বছর পর এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে আরও নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে।’
সূত্র: বাসস